১
কবিতা তোমায়
কবিতা একদিন তোমায় ভালোবেসে?
আমি ছন্নছাড়া এক ভবঘুরে কবি হয়েছিলাম,
যেখানেই এক টুকরো কাগজ পেতাম?
তাতেই লিখতাম তোমার নাম,
লিখতাম কাব্যের ভাষায় তোমার আমার কাল্পনিক প্রেম কাহিনী|
সবাই আমার আচরণে আমায় ব্যঙ্গ করে?
পাগল কবির আখ্যা দিয়েছিলো|
কিন্তু কেউ বোঝেনি আমার তোমাকে ভালোবাসার পিছনে?
কতোটা যন্ত্রনা কান্না লুকিয়ে ছিলো|
আচ্ছা কবিতা তুমি কি জানো? তুমি কি বলতে পারবে?
ভালোবাসায় এতটা দুঃখ কষ্ট যন্ত্রনা মান অভিমান কেন??
কেন বলতো তোমায় ভালোবেসে মাথার বালিশ চিবুক আর?
চোখের কোণ ভরে ওঠে নোনা জলে |
জানো কবিতা তুমি যখন শৈশবে? আমায় খেলার ছলে প্রথম স্পর্শ করেছিলে|
তখনো আমার শিশু মনের রাতের আঁধার কাটেনি,
ওঠেনি প্রথম প্রভাতী সূর্য দিবালোকে |
তবুও শৈশবের ঘুমন্ত চোখে জড়িয়ে নিয়েছিলাম তোমায়,
আমার ছোট্ট বক্ষ মাঝারে আষ্টেপৃষ্ঠে |
তাইতো আজও রয়েছো তুমি আমার হৃদয়ে?
হৃদয়ের রানী হয়েই সেথায় রয়েছো সদা সর্বক্ষণের জন্য বিরাজমানা|
আমার কৈশোর হেসেছে কেঁদেছে তোমার ছোঁয়ায়,
কতো বসন্ত পার করেছি তোমার দেখানো রঙিন স্বপ্নে|
আমার যৌবন উত্তাল হয়েছে তোমার প্রেমে,
প্রতিটি জল তরঙ্গের ঢেউয়ের মতো ছন্দে ছন্দে|
আজ আমি বৃদ্ধ পৌঢ়ত্বের শেষ প্রান্তে এসেও?
একাকী মনের ঘরে একান্তের আবডালে?
হাসি কান্নার দোলাচলে দুলতে দুলতে কেবলি,
কবিতার স্পর্শবিহীন কবি হয়েই রয়ে গেলাম|
যে মনের খোঁজ না কবিতা তুমিও জানো না,
তাই জন সমক্ষে কবিতাকে ভালোবেসেও?
আমার কবি হওয়া হলোনা |
প্রেম সমুদ্রের তলদেশ থেকে বাছাই করে তুলে আনা হলো ঝিনুক,
জীবন পাড়ে জমা হলো অসংখ্য ঝিনুকরাশি
কিন্তু তাতে খুঁজে পেলাম না একটাও মুক্তো|
শুধু কান্নার নোনা জল ধুয়ে দিলো ঝিনুক রাশি,
কবিতাকে ভালোবেসে আমি হলাম শিক্ত|
শুধুই শিক্ত|
২
দেখবে মনে পড়বে
যখন প্রভাতে প্রভাত ফেরীর গান গাইবে?
প্রভাতী গাইয়ের দল|
যখন নবীন সবুজ তার বন বিতান জুড়ে বিছাবে?
চিরসবুজের আঁচল|
যখন ভোরের সূর্য তার আবির আলোয় মাতাবে চারিদিক?
দেখো তখন তোমার মনে পড়বে অবহেলায় অবজ্ঞায়?
দূরে সরিয়ে রাখা আমাকে|
যখন পশ্চিম আকাশে গোধূলি তার রঙের অল্পনা আঁকবে?
যখন সাঁঝ বেলায় ঘরে ঘরে উলু আর শঙ্খ ধ্বণির সাথে সাথে,
পল্লী বধূরা তুলসী মঞ্চ পরে জ্বালবে সন্ধ্যা প্রদীপ?
তখন তোমার ভুলে যাওয়া আমি কে মনে পড়বে |
যখন চাঁদনী রাতে চাঁদ তার জোছনার স্নিগ্ধতায় বাঁধবে?
গোটা আকাশটাকে|
যখন নদীর জলে উঠবে তরঙ্গের ঢেউ দুকূল ছাপিয়ে?
পাড়ের মাটির পা ভেজাবে ছুটে এসে|
সেদিন তোমার আমার মন ভাঙার কথা
ভীষণ রকম ভাবে তোমার আসবে স্মরণে|
যেদিন পাখির ডাকে ভাঙবে তোমার ঘুম?
চোখ খুলে দেখবে বৃষ্টি শ্রান্ত ভোরের আকাশ টাকে|
সেদিন তোমার আমার ভেজা চুলের জলের ছিটা বড্ড মনে হবে|
যেদিন বসন্তের শেষ বেলাতে সাথী হারা কোয়েল টা ডাকবে?
একা বসে কদম গাছের ডালে|
যেদিন রথের মেলায় পাঁপড় খেতে দেখবে সাথীর সাথে সাথীকে?
সেদিন তোমার আমার জন্য মনের মধ্যে গুমরে কেঁদে উঠবে|
৩
নই আমি বনলতা সেন
আমি নই নাটোরের বনলতা সেন,
জানি আমায় নিয়ে লেখা হবেনা কোনো কাব্য কবিতা|
আমি নই শাজাহানের মমতাজ বেগম,
আমার মৃত্যুর পরে তৈরী হবেনা কোনো স্মৃতিসৌধ তাজমহল|
বা আমি নই চন্ডী দাসের সেই রজকিনী|
আমার জন্য একযুগ ছিপ নিয়ে কেউ পুকুর ঘাটে করবেনা অপেক্ষা|
অথবা আমি নই প্রেমিক মজনুর প্রেমিকা লায়লা|
আমার জন্য তিন রাস্তার মোড়ে ছেঁড়া জামা গায়ে ইঁটের ঘায়ে কেউ দেবেনা তার দামী প্রাণ|
নই আমি হীরের রানঝাঁ
আমি জানি আমার জন্য কাঁচা মাটির হাঁড়ি নিয়ে উত্তাল নদী সাঁতরে কেউ হবেনা পার|
নই আমি শ্রীকৃষ্ণের শ্রীরাধিকা,
জানি আমার জন্য কোনো সখা থাকবেনা বসে কদমের ডালে|
আমি অতি সাধারণ নারী একজন,
আমি নই কোনো নাম করা প্রেমিকের প্রেমের নিদর্শন|
তবুও বিশ্ব সংসারে নারী ছাড়া অচল বলে?
নারী হয়ে করি আমি অহংকার|
৪
আমার তুমি
তুমি কি ঘুম থেকে উঠেছো জান?
তোমার পায়ে ঠাই দিয়ে দিও ভালোবাসার মান|
জানিনা কি তোমার প্রেমে কি করেছো জাদু,
তোমায় পুত্রের পিতা ভাবি,ভাবি নাতির দাদু |
সকাল থেকে সাঁঝ আমার একটা শুধু কাজ,
তোমাতেই বিভোর আমি আমার নাইতো কোনো লাজ |
তোমায় ছাড়া খেতে শুতে কিছুই লাগেনা ভালো,
তুমি আমায় যতোই মন্দ বলো|
সারাক্ষণ ইচ্ছে হয় তোমায় একটু দেখতে,
কান দুটি সজাগ থাকে তোমার কথা শুনতে|
প্রতিক্ষণে আমার চোখে ভাসে শুধু ছবি,
আমার গায়ক তুমি আমার কাছে তুমিই শ্রেষ্ঠ কবি|
তোমার বুকে মাথা রেখে ইচ্ছা আমার শেষ ঘুমটাও ঘুমাই,
কাছে থেকো সাথে থেকো তোমার কাছে আর কিছু না চাই |
যদি যাই মরে তবে নতুন জন্মে যেন আবার তোমার কাছেই ফিরে আসি?
তুমি আমার ভালোবাসা আমি তোমায় ভালোবাসি|
৫
অন্তিম ইচ্ছা
আজ তোমরা সবাই জানতে চাও ভীষণ কৌতূহলী হয়ে কি হয়েছে? আমার কেন আমি দিনে দিনে যাচ্ছি ক্ষয়ে |আজ তোমরা সবাই আমায় নিয়ে ভীষণ ভাবে চিন্তিত,বলো শুধু ডাক্তার দেখাও কবিরাজ দেখাও, বলো আরো কতকি?বলি আমি কৌতূহল নিবারণ করো থাকো নিশ্চিত, শোনো মন দিয়ে, আমি যা বলছি,আমার হাতে আর যে সময় নেই তোমাদের উজাড় করে দেবার, আমার এজীবনের কাজ হয়েছে শেষ, আরো কতো কাজ রয়েছে বাকি, সারতে হবে তা জীবন পাতা ভরে লিখতে হবে পূর্ণতা আর ব্যর্থতার কবিতা তবুও একটু অন্তিম ইচ্ছার কথা বলি,যে দিন ফুল বাড়ির আঙিনায় আমার নিষ্প্রাণ দেহখানা রাখা থাকবে সাদা থানে মোড়া ,নাকে সাদা তুলো গোঁজা আর বুকে থাকবে গীতা, আর চোখদুটোতে থাকবে তুলসী পাতা, জানি সেদিন তোমরা সবাই চোখের জলে ভাসতে ভাসতে নিয়ে আসবে আমার জন্য হাতে করে শ্বেতশুভ্র একগুচ্ছ রজনীগন্ধা, দিতে আমায় আমার জীবনের শেষ উপহার,আমার গলায় পরিয়ে দেবে তোমাদের তরফ থেকে আমার মৃত্যু জয়ের মালা,তোমাদের আনা রজনীগন্ধা দেবে আমার বুকের পরে অশ্রু জলে ধুয়ে, মাথার কাছে জ্বলবে তখন ধূপ দানিতে রাখা অনেক জ্বলন্ত ধূপের কাঠি |আমার খালি কপালে সুচন্দনে সাজাবে তোমাদের মনের মতো করে,আমার এ জীবনে ছেড়ে যাওয়া পার্থিব দেহখানা দেবেনা তোমাদের কোনো বাধা, শুধু রাজরানীর মতো শুয়ে থাকবে পালঙ্ক জুড়ে একা,আমার শ্বেত শুভ্র বিছানাটা দেবে সাজিয়ে শ্বেতশুভ্র চাদরে আর শ্বেতশুভ্র দোপাটিতে,আমার অন্তিম যাত্রায় বিদায় জানাবে তোমাদের অশ্রুজলে, ওপাশে বাজবে তখন তপনদার তমা কর্মকার কবিতা খানি|রাজরানী হয়েও এসেছিলাম আমি বিধাতার অভিশাপে? এই ধরিত্রীর বুকে, ভিখারীর খোলসে মোড়া রাজকন্যা রূপে, ছিলাম ছদ্মবেশে তোমাদের মাঝ খানে কালের আবর্তে চারিদিক থেকে ঢেকে নিয়ে ছিলাম নিজেকে, তবুও আজ আমার নির্দিষ্ট নীড়ে যাবার আগে আমি যেতে চাই আমার কাঙ্ক্ষিত রূপে, জীবনের খোলসের বোঝা খুলে, গোধূলির আবির মাখা রঙের হাত ধরে মিলিয়ে যেতে চাই আমি চন্দ্রলোকে পূর্ণিমার জোছনার স্নিগ্ধ ছায়ায় আকাশের বুকে লক্ষ তারার ভিড়ে, কাল পুরুষ আর সপ্তর্ষি মন্ডলের সাথে থাকবো আমি আমার কাঙ্ক্ষিত প্রাণের মানুষের পার্থিব দেহ ছাড়া প্রাণের অপেক্ষাতে|যেদিন এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে যাবে সে আমার কাছে সেই দিন শাপ মুক্তি ঘটবে আমাদের দুজনের আমরা আবার থাকবো দুজনার হয়ে দুজনার কাছাকাছি দুজনার পাশাপাশি|থাকবো নিশ্চিন্তের নীড়ে থাকবো সুখে|
আমার পার্থিব দেহখানা যাবো আমি ছেড়ে?
তবুও তোমাদের মাঝ খানে থাকবো বেঁচে,
আমি আমার গান কবিতা কাব্যের ভীড়ে|
৬
একলা পথের যাত্রী
একলা পথের যাত্রী আমি ঘুরে বেড়াই দেশ হতে মহা দেশে,
ঘুরে ফিরি দিবানিশি পাগলের বেশে|
হেটে চলে ফিরি আমি চাঁদ তারা গ্রহ নক্ষত্রে,
মনের ইচ্ছায় ডানা মেলে ঘুরি ধরণী আর আকাশের বুকে একত্রে|
আমি থাকি ঘোরের ঘোরে
নীরবতার দেশে,
মিথ্যে স্বপ্ন বুকের মাঝে আগলে জীবন নামক মৃত্যুকে ভালোবেসে|
পাশে নেই সখা স্বজন আত্মীয় পরিজন,
তবু আমি যেন জোর করে হয়ে আছি সবার একান্ত আপন|
মাঝে মাঝে মনে হয় জীবনটা শূন্য একটা রাজপথ
যার আছে অসংখ্য চোরাগলি নাই তার নিজস্ব মতামত|
কখনো মনে হয় জীবনটা যেন এক কাগজের তরী,
ভাসাইলে তা ভাসিবে না ভিজিয়া আবর্জনায় নদী যাবে ভারী|
তাইতো একলা পথের যাত্রী হয়ে ঘুরে বেড়াই
দেশ থেকে দেশ হতে মহাদেশে?
জীবন নামক মৃত্যু কে ভালো অতি ভালোবেসে|
No comments:
Post a Comment