১
কর্ণের শেষ সংলাপ
আমি কর্ণ, মহাভারতের এক খলনায়ক।
এই মৃত্যু মুহূর্তেও জানলাম না ভাগ্য বিধাতা কেন আমার প্রতি বিরূপ।
আমি সহিষ্ণু ,বীর , সাহসী, পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান , কর্তব্য সচেতন, ধার্মিক ,ঈশ্বরসাধক আমি দানে হরিশচন্দ্র, আমি ক্ষাত্রবীর্যে তুলনাহীন অথচ আমি আমার মায়ের কুমারী বেলার অসংযত কামনার ফল।
মহাতেজী সূর্য আর মাতা কুন্তীর প্রেমহীন অবৈধ মিলনে আমার জন্ম।
জন্মলগ্ন থেকে আমি পরিত্যক্ত, উপেক্ষিত, বিসর্জিত।
অসীম শক্তিধর সূর্য আমার পিতা হওয়া সত্ত্বেও আমি সূতপুত্র বলে পরিচিত এবং অবহেলিত।
গুরু দ্রোণের থেকে শেখা অস্ত্রবিদ্যার পরখ করতে আমি উপস্থিত ছিলাম হস্তিনাপুরের স্বয়ম্বর সভায়।
দ্রৌপদী আমায় পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে দেননি
তার রুঢ় প্রত্যাখ্যান আমাকে ক্ষাত্রসমাজে লজ্জিত, নতশির ,হতবিহ্বল করে তুলেছিল।
স্বীকার করছি অভিমন্যু বধে
আমার সক্রিয়তা অধর্ম ছিল
কিন্তু দুর্যোধনের কাছে ঋণ আমাকে অবিবেকী গড়ে তোলে।
রুঢ় প্রত্যাখ্যানের জ্বালা মেটাতে দ্রৌপদীকে দ্যূত ক্রীড়ার পর আমি অপমান করেছি কিন্তু সে তো ক্ষাত্রধর্ম।
কবচ কুণ্ডল দান না করলে ভ্রাতা পার্থর পক্ষে অসম্ভব ছিল আমাকে হারানো , কৃষ্ণ আমার পরাজয়ের নেপথ্য নায়ক তুমি।
নির্লজ্জের মত আমার মা কুন্তী এসেছিলেন পুত্রদের প্রাণ ভিক্ষা করতে।
স্ত্রী বৃশালী আমায় পূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারেননি।
অসহ্য যন্ত্রণা গোপন করে গুরু ভার্গবের সেবার পুরস্কার পেয়েছিলাম।
নির্মম অভিশাপ কিন্তু কৃষ্ণ সব রহস্যের মূল তুমি , তুমি আমার মৃত্যুর কারণ। আমার মা কুন্তী কি শেষ মুহূর্তে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দেবেন ? আমার শেষ ঘুম ঘুমানোর আগে আমায় পায়ের ধুলো পবিত্র করো কৃষ্ণ।
**************
২
আমি পৃথা ওরফে কুন্তী
আমি যদুবংশীয় রাজকন্যা পৃথা ওরফে কুন্তী
মহর্ষি দুর্বাসার আশীর্বাদে আমি সন্তান কামনায় যেকোনো কাঙ্ক্ষিত পুরুষ নির্বাচন করতে পারি।
বালিকা সুলভ চপলতায় আমি আহ্বান করেছিলাম শক্তিমান সূর্যদেবকে, তিনি আমার রূপে মুগ্ধ হয়ে আমার কৌমার্য্য হরণ করেন
সেই কুমারী বেলায় আমার পুত্রকে আমি লোকলজ্জায় বিসর্জন দিয়েছিলাম নদীর জলে , মুহূর্তের তরে তাকে আর আমার দুই হাতে কোলে ফিরে পাইনি।
বিবাহিত জীবন ছিল সতীন কাঁটায় ভরা, স্বামী অভিশপ্ত তাই যৌবন ছিল মরুভূমি সমান তৃষ্ণার্ত । রাজকুল রক্ষার্থে নিজেকে সঁপে দিয়েছি ধর্মরাজ যম, পবন দেব এবং দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে সুরম্য রাজ শয্যায় আমার তিন রাতের নায়করা প্রত্যেকে আমাকে সুপুত্রের জননী করেছেন।
আমার পুত্রবধূ দ্রৌপদীকে আমার অসতর্ক সংলাপ গড়ে তুলল বহুগামিনী।
আমার ভ্রাতুস্পুত্র শ্রীকৃষ্ণ বিশ্বের সর্ব নিয়ন্ত্রা, অথচ আমি বিছানায় অক্ষম স্বামী, সতীন, পর পুরুষের ঔরস মেখে পুত্রবতী এবং তারপরেও আমি পঞ্চসতীর একজন।
দূর্যোধন, দুঃশাসনের হাতে আমার রজস্বলা পুত্রবধূর লাঞ্ছনা আমাকে অঝোরে কাঁদিয়েছে। যেমন কেঁদেছি পৌত্র অভিমুন্য আর পুত্র কর্ণর মৃত্যু সংবাদে।
আমি পৃথা আর জীবন দুঃখ-যন্ত্রণার অলঙ্কারে ভূষিতা সব বাঁধন ছিন্ন করে সুখের রাজভোগ উপেক্ষা করে তপোবন চারিণী।
---------
No comments:
Post a Comment