Friday, 29 October 2021

আলেয়া-- সৌম্যদীপ সাহা

আলেয়া

সৌম্যদীপ সাহা


মাঠেঘাটে টহল দিয়েই দিব্যি

কেটেছে আমাদের শৈশবকাল।

আমি ও আমার চার অন্তরঙ্গ বন্ধু,

মাঠকে বাড়ির মেঝে ও মাঠের ঘাসকে

সবুজ নকশার মাদুর মনে করতুম।

সকাল-সন্ধ্যা পড়তে বসা ও

বিকেলে খেলার পাশাপাশি

বিনোদভরের মাঠে রাতে আড্ডা

আমাদের পাঁচজনকে দিতেই হবে,

নচেৎ সেই রাতে ঘুম আর আসবেই না।


মাঠের পাশে একটা নোংরা ডোবা,

মাঝেমধ্যেই ওতে

নীলাভ এক জ্বলন্ত শিখা দেখতে পেতুম।

ভয় পেয়ে আমরা দৌড় লাগাতাম।

বড়দের মুখে শুনেছি ঐ আলো হলো

আলেয়া,আলেয়া ভূত।


গ্রামে এই আলেয়া নিয়ে 

নানা গল্প কথা প্রচলিত আছে,

কেউ বলে আলেয়া হলো 

জমিদার গিন্নির অতৃপ্ত আত্মা,

আবার কারও মতে এটি 

মহাজনের কৃতকর্মের শাস্তি প্রদায়িনী যমদূত।

দুষ্টু শিশু ভাত না খেলে 

মেয়েরা সচরাচর বলে থাকেন,

"ভাত খেয়ে নে,নইলে আলেয়া 

এসে ধরে নে যাবে।"

অমনি দুরন্ত ছেলে জলের থেকেও 

ঠান্ডা হয়ে যেত।


আলেয়া দেখা মাত্রই আমরা 

'আলেয়া ভূত এসেচে,আলেয়া ভূত'—

বলে হল্লা জুড়ে দেবার চেষ্টা করতুম।

জোছনালোকিত রাতে আলেয়া দেখা

মাত্রই সারামাঠ তোলপাড় করে ছুটে 

বেড়ানোতেই যেন —

লাখ টাকার আনন্দ পেতুম।


এরপর কেষ্ট ম্যালেরিয়ায় আমাদের 

ছেড়ে চলে গেল;

মন দিয়ে লেখাপড়ার জন্য বাবা আমাকে

পিসির কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

গ্রামে রইল কেবল কিরণ,বেষ্টা আর দধি।

আমি ছুটিতে গ্রামে আসতুম,

চারজনের সাথে দেখা করে

মাঠে আড্ডাও দিতুম।

সন্ধ্যাকালে একত্রিত হলে

পার্শ্ববর্তী ডোবায় যদি মিটমিটে জ্বলন্ত

আলেয়াকে দেখতুম তখন আমরা 

মনেই করে নিতুম,

আকাশ থেকে কেষ্ট আমাদের সাথে

দেখা করতে এসেচে।


অতিক্রান্ত হল অনেকগুলো বছর।

এখন আমি সরকারি ব্যাংকের কর্মী,

দধি গ্রামে হাই স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক।

কিরণের নিজের ব্যবসা আছে ও

বেস্তা উচ্চ মাধ্যমিক দিয়ে বাবার

জমিতে কাজে লেগে পড়েচে।


আলেয়া কী, তা আমরা এখন

চারজনেই খুব ভালোকরে জানি—

বদহজলাভূমি কিংবা শশ্মানে 

উৎপন্ন মিথেনের সাথে বাতাসের 

অন্যান্য দহনসক্ষম গ্যাস মিশে

নীল শিখায় জ্বলে ওঠে,

এটিই হল আলেয়া।

আলেয়া ভূত বা অশরীরী নয়,

মহাজনের শাস্তির দূতও নয় আর

আমাদের হারানো কেষ্টও নয়।


আজ আমারা চারজনেই যুবক

কিন্তু রাতের তমসায় যদি

ডোবায় জ্বলন্ত আলো দেখতে পাই,

তবে চারজনে আজও 

ছুটোছুটি করে গ্রাম মাথায় 

করার চেষ্টা করি।

আলেয়া যেন আমাদের ফিরিয়ে

দেয় হারানো শৈশব ও কেষ্টকে।

--------------

নাম।সৌম্যদীপ সাহা

ডাকঘর।সিঁথি

নম্বর।6290729588

ঠিকানা।556/1 আমবাগান নেতাজী কলোনি,কলকাতা-৫০

Whatsapp6290729588



No comments:

Post a Comment

মধুময়-- সোনালি মুখার্জি

মধুময় সোনালী মুখার্জি স্বপ্ন তোমায় দিলাম লিখে রেখো যত্ন করে,  ভালোবাসা দিলাম তোমায় নিও হৃদয় ভরে l তোমার সাথেই পথ চলা,  তোমায...